এবার
আসা যাক একটিগুরুত্বপূর্ণ বিধান প্রসঙ্গে আর তা হল নুসরাহ বা বস্তুগত
সমর্থন। এটা নিয়ে সাবধানতার সাথে বিশ্লেষণ করে দেখা যাকআমাদের কী অনুসরণ
করা উচিত, বিশেষ করে আমরাযখন দেখতে পাই যে, ইসলামি রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠার জন্য
যারা কাজ করেন তারা নুসরাহর বিষয়টি অত্যন্ত কম গুরুত্ব দিয়েবিবেচনা করেন।
তারা মনে করে এটি একটিঅগুরুত্বপূর্ণ বিষয় (peripheralmatter)বা এর ইসনাদ
(বর্ণণারসূত্র) ততটা শক্তিশালী নয় বিধায় এটি গ্রহণ করবার প্রয়োজন নেই।
তারা কেবল এখানেই থেমে থাকে না। বরং রাসূলুল্লাহ (সা) এর সবগুলো সীরাতে
সামান্যকিছু ব্যত্যয় ছাড়া সুস্পষ্ট বর্ণণা থাকা সত্ত্বেও এ বিধান ও যারা
এর অনুসরণ করেতাদের কটাক্ষ করা হয়। যদিও সীরাতেরএসব লেখকগণের কারোরই
বর্তমানে অস্তিত্বশীল দলগুলোর সাথে বিন্দুমাত্র সম্পর্ক ছিলনা।
পবিত্র কুরআন তাদের সর্ম্পকে বলেছে,
'সাহায্য সহায়তা দিয়েছে' (সূরা আনফাল:৭২)
এবং তাদের আখ্যায়িত করেছে
'আনসার (সাহায্যকারী)' (সূরা তাওবাহ: ১০০)
এ
বর্ণণা ছিল অত্যন্ত প্রশংসার ও উন্নত আঙ্কিকের যারমাধ্যমে তাদের বৈশিষ্ট্য
প্রতিফলিত হয়। রাসূলুল্লাহ (সা) এর সীরাত বিশ্লেষণ করলে দেখতে পাব যে,
তিনি ক্ষমতাধর নেতৃস্থানীয়লোকদের কাছে নুসরাহ অনুসন্ধান করেছিলেন। একটির
পর একটি গোত্রের কাছ থেকে তিক্ত অভিজ্ঞতা পাওয়াসত্তেও তিনি এ প্রচেষ্টা
অব্যাহত রেখেছিলেন। তিনি দৃঢ়তার সাথে বারংবার নুসরাহ অনুসন্ধান করছিলেন
এবং এব্যাপারে দমে যাননি। ইবনে সা'দ তাঁর তাবাকাতগ্রন্থে উল্লেখ করেন যে,
যতগুলো গোত্রের কাছে তিনি (সা) গিয়েছিলেন তার সংখ্যা পনেরএর কম নয়।
রাসূলুল্লাহ (সা) এরএই অধ্যাবসায় থেকে আমরা যা পাই তা হল, নুসরাহ
অনুসন্ধান করা ছিল আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার পক্ষ থেকে নবী(সা) এর
প্রতি একটি সুস্পষ্ট নির্দেশনা।
পবিত্র কুরআন এ
সাহায্যকারীদের 'আনসার' বলে আখ্যা দিয়েছে, যা এর আরেকটি দলীল। কুরআনে
একাধিকজায়গায় তাদের প্রশংসা করা হয়েছে ও আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা
তাদের ক্ষমাঘোষণা করেছেন। 'মুহাজেরীন' (অভিবাসী) দের পরেইতাদের অবস্থান।
নুসরাহ (সমর্থন বা সহায়তা) অনুসন্ধান করারবাধ্যবাদকতাঃ
ইসলামিক
রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে রসুলাল্লাহ (সাঃ) এর পদ্ধতিঅনুযায়ী শাসককে
জবাবদিহিতা করা এবংইসলামের পক্ষে জনমত তৈরি করার পাশাপাশি সমাজের
নেত্রিত্বস্থানীয় বা প্রভাবশালী ব্যাক্তিবর্গের (যাদেরকে আমরা আহলাল
নুসরাহ বলবো) সমর্থন পাওয়াটা জরুরী।
আমরা প্রত্যক্ষ করছি
যে, আরবের(মধ্য-প্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা) গণজাগরণগুলোতে মুসলিমগণ
কুফর-শাসনের পরিবর্তন চাচ্ছে, কিন্তু সেনাবাহিনীতে (বিশেষত কিছু
গুরুত্বপূর্ণ জেনারেল বা কমান্ডারদের কাছে) তাদের সমর্থন না
থাকায়গণজাগরণগুলো বিচ্যুত হয়ে যাচ্ছে বা অসমাপ্ত রয়ে যাচ্ছে কারণ সমাজের
আসল ক্ষমতার কাছে তাদের বার্তাপৌছায়নি।
ইবন কাসির বর্ণনা
করেন, আলী ইবন আবি তালিব (রাঃ) বলেনঃ “নবুওয়তের৯ম/১০ম বছরে যখন আল্লাহ
(সুবহানাহু ওয়া তা’লা) তাঁর রসুল (সাঃ) কে নির্দেশ করলেন যেন তিনি(সাঃ)
আরব গোত্রগুলোর কাছে নিজেকে উপস্থাপন করতে, তিনি (সাঃ) আমাকে এবং আবু বকর
(রাঃ) কে নিয়ে মিনাতে গমন করলেন যেখানে অনেক গোত্রেরসাথে সাক্ষাৎ করি”।
[বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩য়খন্ড]
ইবন ইসহাক বর্ণনা করেন,
আজ-জুহরি (রাঃ) বলেন, “রসুলুল্লাহ(সাঃ) বনু আমির বিন সা’সা’হ এর নিকট
গিয়েআল্লাহ্র পথে ডাকেন এবং প্রস্তাব দেন যে, “আমাকে সমর্থন দেও আর
আমাকে নিরাপত্তা দেও”।
তাদের মধ্যে বায়হারা বিন ফিরাস নামের
একব্যাক্তি বলল, “আল্লাহ্র শপথ, কোরাইশেরএ যুবককে সমর্থন দিলে তাঁর সাথে
সমগ্র আরব জয় করতে পারব”।
তারপর ব্যাক্তিটি রসুলুল্লাহ
(সাঃ) কে জিজ্ঞাসা করলেন, “আপনি কি মনে করেন আমরা যদি আপনাকে সমর্থন করি
এবং আল্লাহ আপনাকে বিজয় দান করেনতাহলে আল্লাহ আপনার পর আমাদেরকে
কর্তৃত্বদিবেন”?
রসুলুল্লাহ (সাঃ) উত্তর দিলেন, “কর্তৃত্ব একমাত্র আল্লাহরই, আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তাকে দেন”।
বায়হারা
বলল, “আরবের উপকন্ঠে আপনার নিরাপত্তার জন্য আমাদের কে উপস্থিত করবেন, আর
আপনার বিজয়ের পর কর্তৃত্ব অন্যের কাছে চলেযাবে?আপনার দ্বিনের আমাদের দরকার
নাই”।
বনু আমিরের এক পন্ডিতের (যে এবারের হজ্জ ও
স্বাভাবিকভাবেই রসুলাল্লাহ (সাঃ) এর সাথেসাক্ষাৎ করতে পারে নি) কাছে যখন এ
খবরটি পৌছায় তখন তিনি বায়হারাকে বললেন, “আমাদের কি কোন পথ খোলা নাই এ
সুযোগ আবার পাওয়ার? যারহাতে আমার সত্ত্বা তাঁর কসম খেয়ে বলছি, ইসমাইলএর
কোন বংশধর একে মিথ্যাপ্রতিপন্ন করতে পারবে না। এটা আসলেই সত্য। তাঁর(সাঃ)
এর কথা বিবেচনা করতে তোমারবিচার-বুদ্ধির কি হয়েছিল? [ইবন হিসাম এবং ইমাম
আত তাবারিতেওবর্ণিত। ইবন কাসিরের “বিদায়া ওয়ান নিহায়া”র ৬ষ্ঠ খন্ডেও
বর্ণিত]
রসুলুল্লাহ (সাঃ) বনু শেবান বিন সালাবা এর সাথেও
যোগাযোগ করেছিলেন, যারা বলেছিল আরবের (যেকোন গোত্রের) বিরুদ্ধে রসুলাল্লাহ
(সাঃ) কে সাহায্যকরবেন,তবে পারস্যের বিরুদ্ধে নয়। কিন্তু রসুলুল্লাহ (সাঃ)
এ ধরনের শর্তসাপেক্ষসাহায্য গ্রহণ করেননি, কারণ তিনি চেয়েছিলেন শর্তহীন
সাহায্য (সমগ্র বিশ্বেরবিরুদ্ধে),যা ইঙ্গিত করে যে তিনি (সাঃ) চাচ্ছিলেন যে
রাষ্ট্রের মাধ্যমে ইসলামি দ্বীনএকবার প্রতিষ্ঠিত হলে তা সারা বিশ্বে
ছড়িয়ে দিতে। আব্দুল্লাহ ইবন কা’ব ইবন মালিক হতে জানা যায়, রসুলুল্লাহ
(সাঃ) বনু কাল্ব এর নিকট নিরাপত্তা চেয়েছিলেন কিন্তু তারাশর্তে রাজি হয়
নি। [বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩য়খন্ড]
ইবন আব্বাস (রাঃ)
বর্ণনা করেন, আলিইবন আবি তালিব (রাঃ) বলেছেন, “যখন আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া
তা’লা)আরবের বিভিন্ন গোত্রের কাছে দাওয়াহ নিয়ে যেতে বললেন, রসুলুল্লাহ
(সাঃ) আবু বকর (রাঃ) কে নিয়ে মিনা গমন করেন। বিভিন্ন গোত্রের সাথে সাক্ষাৎ
করে একসময় বনু সাইবান সালিবাহ’র নিকট পৌছালেন। কথা প্রসঙ্গে আবু বকর
(রাঃ) তাদেরজিজ্ঞাসা করলেন, “তোমরা সংখ্যায় কত?”, তারা উত্তর দিলেন, “১
হাজার, আর ১ হাজার কোন কম নয়”। তিনি (রাঃ)আবার জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমাদের
প্রতিরক্ষা ব্যাবস্থা কেমন?”, তারা উত্তরে বললেন, “আমরাসবসময় যুদ্ধ করি
(এবং নিজেদের প্রতিরক্ষা করি) কারণ প্রত্যেক জাতিই যুদ্ধরত অবস্থায় থাকতে
বাধ্য”। আবু বকর (রাঃ) আবার জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমাদের যুদ্ধের ফলাফল কিরকম
হয়?”, তারা বলল, “আমরাযখন যুদ্ধ করি আমরা উন্মত্ত থাকি, যুদ্ধকে রক্তাক্ত
করে তুলি। আমরা সন্তানদের থেকে ঘোড়াগুলোকে বেশিযত্ন করি,দুগ্ধপোষ্য পশু
থেকে অস্ত্রকে বেশীপছন্দ করি। বিজয়ের কথা যদি বলি, বিজয় আল্লাহ্র হাতে,
কখনও আমরা বিজয়ী হই, কখনও বিপক্ষরা”...”। [এখানেকিছুটা সংক্ষেপে বর্ণনা
করা হয়েছে, দীর্ঘ আলোচনা ইমাম বায়হাকির “দালাইল আল নুবুওয়া”; আবু
নুয়াইম হতে বর্ণিত ইমাম হাকিমের সাহিহ তে পাওয়া যায়]
উপরের
বর্ণনা থেকে পাওয়া যায় যুদ্ধের ময়দানে শক্তি সামর্থঅনুধাবন করে বিভিন্ন
গোত্রের কাছে রসুলুল্লাহ (সাঃ) ইসলামের দাওয়া নিয়ে যান এবং মুসলিমদের
প্রতিরক্ষাদেওয়ার মাধ্যমে ইসলামিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠারপ্রতিশ্রুতি
চেয়েছেন।
তাহলে বর্তমানে মুসলিম উম্মাহর সবচেয়ে বড় সমর্থন
বা সহায়তাসেনাবাহিনীতেই (যাদেরকে আমরা “আহলাল নুসরাহ” বলতেপারি) রয়েছে।
খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য এবং অবৈধশাসকদের উৎখাতের জন্য শরিয়াহগত
পদ্ধতি হিসেবেমুসলিম উম্মাহর মধ্যে জনমত
রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,
'হে
অমুক ও অমুক গোত্র। আমি তোমাদের কাছে প্রেরিত আল্লাহর রাসূল (সা)। তিনি
সুবহানাহু ওয়াতা’আলা তোমাদের নির্দেশদিচ্ছেন ইবাদত করবার ও তার সাথে কাউকে
শরীক না করবার.....আমার উপর বিশ্বাস স্থাপনকরবে ও আস্থা রাখবে এবং ততক্ষণ
পর্যন্ত আমাকে সমর্থন প্রদান করবে যতক্ষণ না আমিআল্লাহ প্রদত্ত হুকুমসমূহ
লোকদের কাছে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরছি।' (সীরাত ইবনে হিশাম)
যখন
রাসূলুল্লাহ (সা) এর চাচা আবু তালিব ও বিবি খাদিজা (রা)একই বছরে ইন্তেকাল
করলেন তখন তাদের মৃত্যুর কারণে তার ভাগ্যাকাশে দূর্যোগের মেঘআরও ঘনীভূত হল।
চাচার মৃত্যুর পরকুরাইশগণ রাসূলুল্লাহ (সা) এর উপর নির্যাতনের খড়গহস্ত
আরও কঠিনভাবে চালাতে উদ্যতহল। এ ব্যাপারে তিনি (সা)বলতেন,
'আবু তালিবের মৃত্যুর পর কুরাইশগন যত ঘৃণিত কাজ করেছিল ততটাআর কখনওই করেনি।' (সীরাতে ইবনে হিশাম)
আবু
তালিবের মৃত্যুর পর নিজের ও তাঁর লোকদের সুরক্ষা ওনুসরার জন্য রাসূলুল্লাহ
(সা) তায়েফ গিয়েছিলেন। এ বিষয়ে তিনি বানু সাকিফ গোত্রের কিছু
নেতৃস্থানীয় লোকেরসাথে দেখা করেছিলেন। তিনি তাদের সাথেইসলামকে সমর্থন করা ও
এর পাশে দাঁড়ানোর জন্য কথা বলেন, তার গোত্রের যে কেউতার বিরুদ্ধে
দাঁড়াবে তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবার জন্য বললেন। তারা এ
আহ্বানপ্রত্যাখান করেছিল এবং বারণ করা সত্ত্বেও তাদের সাথে যোগাযোগের
বিষয়টি গোপন নারেখে প্রকাশ করে দিয়েছিল। বিশেষ প্রহরা ছাড়া মুহম্মদ (সা)
মক্কায় প্রবেশ করতেপারেননি।
রাসূলুল্লাহ (সা) বিভিন্ন গোত্রের দরজায় দাঁড়িয়ে আহ্বানজানিয়ে বলতেন,
'হে অমুক গোত্র! আমি তোমাদের কাছে প্রেরিত আল্লাহর রাসূল। তিনি নির্দেশ দিচ্ছেনযে, তোমরা আল্লাহর উপাসনা করবে এবং তাঁর সাথে কাউকে শরীক করবেনা। এইসব মূর্তি থেকে যেকোন কিছু গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকো এবং আমার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর ও ঈমান আন। ততক্ষণ পর্যন্ত আমাকেরক্ষা কর যতক্ষণ না আল্লাহ আমাকে যা দিয়ে পাঠিয়েছেন তা লোক সামনে তুলে ধরছি।' (সীরাত ইবনে হিশাম)
রাসূলুল্লাহ
(সা) এর চাচা আবু লাহাব ছায়ার মত তাঁর পেছনেলেগে থাকত এবং তিনি যা বলতেন
তার জবাব দিত ও প্রত্যাখান করত। কেউ তার কথা গ্রহণ করত না, তারা সাধারণত
বলত, 'তোমার লোকেরা যারাতোমাকে আরও ভাল জানে তারাই তোমাকে অনুসরণ করে না।'
তারা কথা বলত ও তর্ক করত। অন্যদিকে তিনি তাদের সাথে কথা বলতেন এবং আল্লাহর দিকেআহ্বান জানাতেন এই কথা বলে,
"হে আল্লাহ (আমার প্রভু), যদি তোমার ইচ্ছাথাকত! (তারা) এরকম হতো না। "
সীরাত
ইবনে হিশামে উল্লেখ আছে, আয-জুহরী বর্ণণা করেনযে,মিনাতে রাসূলুল্লাহ(সা)
বানু কিন্দা গোত্রের কাছে তাদের আবাসস্থলে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি নিজেকে
উপস্থাপন করেছেন ও প্রত্যাখাত হলেন। তিনি আরও বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা)বানু
কা'বগোত্রের কাছে যান এবং প্রস্তাব দেন। কিন্তু আগের মতই প্রত্যাখাত হন।
তারপর তিনি বানু হানিফা গোত্রের কাছে গিয়ে একইভাবেপ্রস্তাব দেন এবং তাদের
প্রত্যাখান ছিল আরবদের মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট। তিনি বানু আমির বিনবানু
সা'সা' এর কাছে গিয়েছিলেনএবং তাদের আল্লাহর দিকে আহ্বান করেন ও নিজেকে
উপস্থাপন করেন। বহাইরা বিন ফিরাস নামে তাদের মধ্যকার একজন বলল,
'আল্লাহর
কসম, আমি যদি কুরাইশের এই তরুণকে নিতে পারতাম তাহলে পুরো আরবদেরপরাজিত
করতে পারতাম।' সে রাসূলুল্লাহ (সা)কে প্রশ্ন করল, 'তুমিকি মনে কর, যদিআমরা
তোমাকে অনুসরণ করি এবং স্রষ্টা তোমার শত্রুদের বিরুদ্ধে তোমাকে বিজয় দান
করেতবে তোমার পরে আমাদের হাতে ক্ষমতা আসবে?' নবী (সা) উত্তর দিলেন,
'ক্ষমতার মালিক আল্লাহ এবং তিনি যাকে খুশী তাকে তা দান করেন।'
বহাইরা
উত্তর দিল, 'আমরা তোমাকে রক্ষা করবার জন্য আরবদের কাছে আমাদের গলাউন্মুক্ত
করে দেব আর যখন তুমি বিজয়ী হবে তখন ক্ষমতা চলে যাবে অন্য কারও হাতে!তাহলে
তোমার ক্ষমতার আমাদের প্রয়োজন নেই!'
রাসূলুল্লাহ (সা)
এরকমই করে যেতে থাকলেন। যখন হজ্জের মৌসুমেলোকেরা জমায়েত হত, তিনি(সা)
সেখানে উপস্থিত হতেন এবং তাদের আল্লাহর দিকে আহ্বান জানাতেন। তিনি (সা)
নিজেকেউপস্থাপণ করতেন এবং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার পক্ষ থেকে প্রাপ্ত
নির্দেশনা ও রহমততুলে ধরতেন। যখনই রাসূলুল্লাহ(সা) জানতে পারতেন যে কোন
স্বনামধন্য ও সম্মানিত আরব এসেছেন তখনই তিনি কালবিলম্বনা করে তাকে আল্লাহ
সুবহানাহু ওয়া তা’আলার দিকে আহ্বান জানাতেন ও তাঁর প্রতি নাজিলকৃত
বাণীসমূহউপস্থাপন করতেন।
ইতিবাচক সাড়া না দিলেও রাসূলুল্লাহ
(সা) যে সব গোত্রেরসাথে দেখা করেছিলেন, ইসলামেরদাওয়াত দিয়েছিলেন এবং
নিজেকে তাদের সামনে উপস্থাপন করেছিলেন তারা হল:
১) বানু আ'মির বিন সা'সা'
২) মুহারিব বিন খাসফাহ
৩) ফাজারাহ
৪) ঘাসান
৫) মুররাহ
৬) হানিফাহ
৭) সুলায়েম
৮) আবাস
৯) বানু নাদর
১০) বানু আল বুকা
১১) কিন্দা
১২) কা'ব
১৩) আল হারিস বিন কা'ব
১৪) উজরাহ
১৫) আল হাদারিমাহ
ইবনে সাদ এর 'আত তাবাকাত' শীর্ষক বই অনুসারে এই তালিকা উল্লেখ করা হল।
এছাড়াও
রাসূলুল্লাহ (সা) ও যাদের কাছে নুসরাহ অনুসন্ধানকরা হয়েছিল তাদের মধ্যে
যে আলোচনা হয়েছিল অথবা দ্বিতীয় আকাবার শপথে তার (সা) ওবাই'য়াত
প্রদানকারীদেরমধ্যকার যে সংলাপ হয়েছিল-তা থেকে বুঝা যায় নবী (সা) একটি
লক্ষ্যে এ কাজে (নুসরাহঅনুসন্ধান) অগ্রসর হয়েছিলেন ও এ কাজের উপর দৃঢ়
ছিলেন; অর্থাৎ দ্বীনপ্রতিষ্ঠা ও এমন এক (শক্তিশালী) সত্ত্বা প্রতিষ্ঠার
জন্য যা দ্বীনকে বাস্তবায়ন, সুরক্ষা প্রদান ওবিস্তারের কাজ করবে। সুতরাং
কীভাবে আমরাএটিকে অবজ্ঞা করি যখন এর মাধ্যমে দাওয়াত একটি পর্যায় থেকে
আরেকটি পর্যায়ে উন্নীতহয় ও একটি ভূমিতে একটি ব্যবস্থাকে বাস্তবায়ন ও
প্রসারের সুযোগ সৃষ্টি করে। তাহলে এ অবজ্ঞা কারস্বার্থে?
-
কুফফারগণ বুঝতে পেরেছিল যে, এ কাজের পেছনে রয়েছে একটি অঙ্গীকার ও
দ্বীনবিজয়ের বীজ। একারণে আমরা দেখতেপাই বানু আমীর গোত্র বুঝতে পেরেছিল এ
বিষয়টি ক্ষমতার সাথে বিজড়িত। মক্কার কুফফারগণেরকাছে যখন দ্বিতীয় আকাবার
খবর পৌঁছায় তখন তারা তেলেবেগুনে জ্বলে উঠেছিল। তারা বলেছিল, 'হে খাজরাজের
লোকেরা! আমাদেরকাছে খবর আছে যে, তোমরাআমাদের সাথীর সাথে যোগাযোগ স্থাপন
করেছ এবং তাকে আমাদের থেকে নিয়ে গিয়ে আমাদের বিরুদ্ধেযুদ্ধ করবার জন্য
অঙ্গীকারাবদ্ধ করেছ।' আমরা দেখতে পাই শয়তান সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে চিৎকার
করেবলেছিল,'হে আখাসীবের (কুরাইশ)লোকেরা,তোমরা কি মুহম্মদ ওতার সাহাবাগন
(মুশরিকদের দৃষ্টিতে দ্বীনত্যাগী) কে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্যএকত্র
হওয়া পছন্দ কর?'
দ্বিতীয় আকাবার শপথের সময় আল বারা বলেন,
'হে রাসূলুল্লাহ, সুতরাং আমরা বাই'আত প্রদান করলাম। আল্লাহর কসম, আমরা বংশ
পরষ্পরায়নেতা থেকে নেতাতে যোদ্ধা ও অস্ত্র চালনায় পারদর্শী ও সুসজ্জিত।'
আবুল হায়সামি ইবনুলতাইহান বলেন, 'হেআল্লাহর রাসূল, আমাদেরঅন্যদের লোকদেও
(ইহুদী) সাথেও সর্ম্পক রয়েছে। যদি আমরা তাদের প্রতি কঠোর হই এবং সম্ভবত সে
সময় আল্লাহযদি আপনাকে বিজয়ী করেন তাহলে কি আপনি আমাদের প্রত্যাখান করে
নিজের লোকদের কাছেফিরে আসবেন?' আসাদবিন জুরারাহ বলেন, 'আজতাকে নেওয়া মানে
সকল আরবের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ করা, তোমাদের মধ্যকার সম্ভ্রান্তগন কতল হওয়া
এবংতলওয়ারেরে তিক্ত স্বাদ নেওয়া।
এ বিষয়ে আল আব্বাস বিন
উবাদা রাসূলুল্লাহ (সা) কে বলেন, 'সেই সত্তার কসম যিনিআপনাকে একজন সত্য নবী
হিসেবে প্রেরণ করেছেন, যদি আপনার ইচ্ছা তাই হয় তাহলে আগামীকালই আমরা
মীনাবাসীরবিরুদ্ধে অস্র ধারণ করতে প্রস্তত।'
আল হায়সামীর প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে রাসূলুল্লাহ (সা) উত্তরদিলেন,
'না, রক্ত তো রক্তই; আর রক্তের বদলা রক্তই। আমি তোমাদের জন্য আরতোমরাও আমার জন্য। তোমরা যাদের সাথে যুদ্ধ করবে আমিও তাদের সাথে যুদ্ধ করব আরতোমরা যাদের সাথে সন্ধি চাইবে আমার সন্ধিও তাদের সাথেই।'
আয়েশা (রা) বলেন যে,
তাকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা সাহায্য, ক্ষমতাশালী লোক, সমরাস্ত্র ও সমর্থনদিয়ে সন্তুষ্ট করেছিলেন।
ইবনে হিশাম রাসূলুল্লাহ (সা) এর নুসরাহ অনুসন্ধান নিয়েমন্তব্য করতে গিয়ে বলেন
, 'আল্লাহ যখন তার নবী (সা) কে শক্তিশালী ওদ্বীনকে বুলন্দ করতে চাইলেন তখন আনসারদের মধ্য হতে এই লোকগুলোকে দিয়ে সহায়তাকরলেন।'
এসব
মন্তব্য থেকে এই হুকুমের ব্যাপারে সুস্পষ্ট নির্দেশনাপাওয়া যায় এবং একজন
ইসলামের দিকে আহ্বান করার পরিপ্রেক্ষিতে ইতিবাচকপ্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করলে
সে দ্বীনকে সমর্থন করল-এরূপ ব্যাখ্যা বা নির্দেশনারভ্রান্তি থেকে মুক্ত
রাখে। বাই'আত, ইজহার উদ দীন (দ্বীনের বিজয় কবুল করা); নাসর (সমর্থন),
যুদ্ধ; বিশিষ্টজনেরা হত্যারসম্মুখীন হবে; তলোয়ারেরআঘাতে তারা ঘায়েল হবে;
এটাসব আরবের বিরুদ্ধে যাবে; তাদের এমনভাবে সুরক্ষা দেয়া উচিত যেভাবে নারী ও
শিশুদেরদেয়া হয়- এসব অভিব্যক্তি থেকে বুঝা যায় কীভাবে রাসূলুল্লাহ (সা)
নুসরাহঅনুসন্ধান করেছিলেন। তিনি তা করেছিলেনসুরক্ষার খাতিরে এবং এমনকি
প্রয়োজনে দ্বীন বহনের জন্য শক্তি প্রয়োগের নিমিত্তে ওএমন একটি রাষ্ট্র
প্রতিষ্ঠা করবার জন্য যা দ্বীন ও এর অনুসারীদের রক্ষা করবে। সাথে সাথে
এরহুকুমসমূহ বাস্তবায়ন ও বিশ্বের কাছে দাওয়াত পৌঁছে দেবার কাজ করবে।
এ বাস্তবতায় একজন বুঝতে পারবে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) নিম্নলিখিতকাজগুলো করেছিলেন:
-
তিনি ব্যক্তির নিরাপত্তা ও দাওয়াতের সুরক্ষার জন্য সমর্থনঅনুসন্ধান
চেয়েছিলেন। এটা মুশরিকদের কাছ থেকে চাওয়া যায় যেমনিভাবে তার চাচাতাকে
সুরক্ষা প্রদান করেছিলেন অর্থাৎ তার উপর আপতিত যে কোন ক্ষতির হাত থেকে
রক্ষাকরেছিলেন। এটা মুত’ঈম বিন আদি'র ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কেননা তিনি (সা)
তায়েফথেকে আদি'রসহায়তায় মক্কায় প্রত্যাবর্তন করেন। সুরক্ষার বিষয়টিকে
মুসলিমদের দ্বীনের সাথে আপোষ করবার জন্যব্যবহার করা যাবে না। দাওয়াতের গতি
কিছুটা শ্লথ করতে অনুরোধ করায় রাসূলুল্লাহ (সা)তার চাচাকে বলেছিলেন,
'আল্লাহর কসম, হে আমার চাচা! যদি তারা দাওয়াতকে পরিত্যাগ করবার জন্য আমারডান হাতে সূর্য আর বাম হাতে চন্দ্র এনে দেয়, তারপরেও আমি দ্বীনকে পরিত্যাগ করব না যতক্ষণনা আল্লাহ এ দ্বীনকে বিজয়ী করে বা এ দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আমি নিহত হই।' (সীরাত ইবনে হিশাম)
-
রাসূলুল্লাহ (সা) সাধারণত নেতাদের সাথে যোগাযোগ করতেন এইকামনায় যে, তারা
ঈমানআনলে তাদের অনুসরণকারী সাধারণ লোকেরাও ঈমান আনবে। দাওয়াত প্রসারণকে
সহজতর করা ও গ্রহযোগ্য করবার জন্য তিনিএটা করেছিলেন। এটা
দাওয়াতেরজনপ্রিয়তার ভিত্তি (কাই'দাহ শা’বিয়্যাহ, popular base) তৈরিতে
ব্যাপক ভূমিকা পালন করেছিল।
- রাসূলুল্লাহ (সা) ক্ষমতাধর
লোকদের কাছে নুসরাহ অনুসন্ধানকরেছিলেন এই শর্তে যে, তারাইসলাম গ্রহণ করবে -
যে রকমটি ঘটেছিল আল আকাবার দ্বিতীয় শপথের ক্ষেত্রে।
নুসরাহ
অনুসন্ধান করা হয়েছিল ক্ষমতাধর লোকদের কাছ থেকে। রাসূলুল্লাহ (সা) এরসময়
এমনসব ক্ষমতাবান লোকদের কাছে নুসরাহ সন্ধান করা হয়েছিল যাদের রয়েছে
নেতৃত্বও জনপ্রিয়তা। সেসময় নেতারাই শাসকছিল;তারা আবারসেনাবাহিনীর প্রধানও
ছিল এবং তাদের মতামতের উপর জনগন আস্থাশীল ছিল।
আজকের দিনে
শাসকেরা বলপ্রয়োগে ক্ষমতায় আসীন হয় এবং তারাঅজনপ্রিয়। আবার অনেকসময়
জনপ্রিয়তাযা দেখা যায় তা প্রকৃত চিত্র নয়। এক্ষেত্রে আমাদের তাই করতে
হবে যা রাসূলুল্লাহ (সা) করেছিলেন। সুতরাং আমরা সমাজেপ্রভাবশালী এমনসব
লোকদের সাথে যোগাযোগ করব যাদের মাধ্যমে তাদের অনুগামী অন্যলোকদের কাছে
পৌঁছানো সহজতর হয়-যাতে করে জনপ্রিয়তার ভিত্তিমূল অর্জিত হয়। আর রাষ্ট্র
ক্ষমতায়আসীন হবার লক্ষ্যে ক্ষমতাশালী লোকদের কাছে নুসরাহ অনুসন্ধান করব,
যেমন: সামরিক বাহিনীরঅফিসার। তাছাড়া যখন দলেরসদস্যদের উপর অত্যাচারের
মাত্রা বেড়ে যায় তখন তাদের বন্ধু ও আত্নীয়স্বজনদের কাছথেকে সাহায্য
প্রার্থনা করা দোষণীয় নয় এই শর্তে যে এর ফলে দাওয়াকারীর ঈমানকোনরূপ চাপ
বা আপোষের সম্মুখীন হবে না। এভাবে বর্তমান বাস্তবতাকে বিবেচনায় এনে
রাসূলুল্লাহ (সা) কেঅনুসরণ করতে হবে।
তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন,
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন
'মুমিনদের সাহায্য করা আমার দায়িত্ব।' (সূরা রূম:৪৭)
তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) আরও বলেন,
'আল্লাহ্ নিশ্চয়ই তাদেরকে সাহায্য করবেন, যারা আল্লাহকে সাহায্য করে। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ পরাক্রমশালী, শক্তিধর।' (সূরা হজ্জ্ব:৪০)
তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) আরও বলেন,
'তোমাদের মধ্যে যারাবিশ্বাস স্থাপন করে ও সৎকর্ম করে, আল্লাহ্ তাদেরকেওয়াদা দিয়েছেন যে, তাদেরকে অবশ্যই পৃথিবীতে শাসনকর্তৃত্ব দানকরবেন। যেমন তিনি শাসনকর্তৃত্ব দান করেছেন তাদের পূর্ববর্তীদেরকেএবং তিনি অবশ্যই সুদৃঢ় করবেন তাদের ধর্মকে, যা তিনি তাদের জন্যপছন্দ করেছেন এবং তাদের ভয়-ভীতির পরিবর্তে অবশ্যই তাদেরকে নিরাপত্তা দান করবেন। তারা আমার ইবাদত করবেএবং আমার সাথে কাউকে শরীক করবে না।' (সূরা নূর:৫৫)
by
তারিক বিন যিয়াদ (
Notes) on Tuesday, 16 April 2013 at 22:42
Opinions: